
Description
নগরজীবনের পরিচিত কোলাহল থেকে বহু দূরে, বিহারের বিস্তীর্ণ অরণ্যভূমির নিসর্গ ও মানুষের জীবনের মধ্যে এক অদ্ভুত জগতের সন্ধান মেলে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস আরণ্যক-এ। সত্যচরণের চোখ দিয়ে দেখা এই অরণ্য কেবল গাছপালা, পাহাড়, নদী আর নির্জন প্রান্তরের সমষ্টি নয়—এ যেন নিজেই এক জীবন্ত চরিত্র, যার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো মমতার, কখনো বিস্ময়ের, আবার কখনো নির্মম বাস্তবতার। চাকরির সূত্রে কলকাতা থেকে অরণ্যাঞ্চলে এসে পৌঁছায় শিক্ষিত যুবক সত্যচরণ। তার কাজ জমি বন্দোবস্ত করা, অরণ্য পরিষ্কার করে বসতি ও কৃষিজমি গড়ে তোলা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে বনভূমিকে সে প্রথমে কেবল নিজের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছিল, সেই অরণ্যই ধীরে ধীরে তার অনুভূতি ও চিন্তার গভীরে জায়গা করে নেয়। অরণ্যের বিস্ময়কর সৌন্দর্যের পাশাপাশি সে পরিচিত হয় সেখানে বসবাসকারী অসংখ্য দরিদ্র, সরল, বিচিত্র ও প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে। রাজু পাঁড়ে, যুগলপ্রসাদ, মটুকনাথ, ধাতুরিয়া, কুন্তা, মঞ্চী, রাজা দোবরু পান্না কিংবা ভানুমতীর মতো চরিত্রগুলো সত্যচরণের অরণ্যজীবনকে নানা রঙে সমৃদ্ধ করে। কারও জীবনে দারিদ্র্য, কারও জীবনে স্বপ্ন, কারও মধ্যে প্রকৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা, আবার কারও জীবনে সমাজের নির্মমতার ছাপ—সব মিলিয়ে অরণ্য হয়ে ওঠে মানুষের বিচিত্র জীবনের এক বিশাল মঞ্চ। তবে আরণ্যক-এর গভীরতম সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কের সেই সূক্ষ্ম টানাপোড়েনে। যে অরণ্যকে মানুষের প্রয়োজনের জন্য ধীরে ধীরে কেটে ফেলা হয়, তার প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া গাছ যেন সত্যচরণের মনে এক ধরনের অপরাধবোধ ও বিষাদের জন্ম দেয়। সভ্যতার বিস্তার আর প্রকৃতির বিনাশের এই দ্বন্দ্ব উপন্যাসটিকে শুধু একটি অরণ্যজীবনের কাহিনি না রেখে করে তুলেছে এক গভীর মানবিক ও পরিবেশচেতনার উপাখ্যান। আরণ্যক তাই কেবল একটি উপন্যাস নয়; এটি অরণ্যের সৌন্দর্য, মানুষের সরলতা, দারিদ্র্য, স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং হারিয়ে যেতে থাকা এক পৃথিবীর স্মৃতিচারণ। বিভূতিভূষণের মায়াময় ভাষায় অরণ্যের যে জগৎ এখানে নির্মিত হয়েছে, তা পাঠ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় পাঠকের মনে থেকে যায়। অরণ্যকে দেখতে দেখতে একসময় মানুষ নিজের ভেতরের অরণ্যকেও চিনতে শেখে।
Ratings & Reviews
No reviews yet.
Log in to leave a review.